পুরাতন দাদ এর ঘরোয়া চিকিৎসা

পুরাতন দাদ এর ঘরোয়া চিকিৎসা নিয়ে আমাদের আজকের প্রতিবেদন। দাদ যাকে টিনিয়া বলা হয়।এটি একটি ছত্রাকের সংক্রমন যা মাথার ত্বক, দেহের ত্বক এবং নখকওে প্রভাবিত করে। দাদ নামটি শুনলেই অশ্বস্তি লাগে। কারণ এই অবস্থাটি কৃমি দিয়ে নয় ছত্রাকের কারণে হয়।
পুরাতন দাদ এর ঘরোয়া চিকিৎসা

শরীরের বহিরাংশে ফুসকুড়ি মত হয় এবং অসহ্য রকমের চুলকানি জ্বালাপোড়া ইত্যাদি হয় এটাকে দাদ বলে। দাদ এর চিকিৎসা সঠিক সময় অথবা সঠিকভাবে না করলে দাদ গুরুতর হয়ে যেতে পারে। আসুন জেনে নেয়া যাক পুরাতন দাদ এর ঘরোয়া চিকিৎসা।

দাদ দেখতে কেমন 

ছত্রাকের সংক্রমনের প্রভাবে দাদ রোগের সৃষ্টি হয়। দেহের ত্বক, শরীরের নখের অংশেও এছাড়াও মাথার ত্বকেও দাদ হতে পারে। বৃত্তাকার ফুসকুড়ি অথবা গোলাকার ফুসকুড়ি লালচে ভাব অত্যন্ত চুলকানি প্রদাহ জ্বালাপোড়া ইত্যাদি যদি হয়ে থাকে তাহলে নিশ্চিত হয়ে যাবেন যে এটা দাদ। সহজ ভাবে বলতে গেলে দাদকে লাল চুলকানি যুক্ত গোলাকার ফুসকুড়ি হিসেবে চিহ্নিত করা যায় এবং এটি শরীরের যে কোন জায়গায় হতে পারে। আর এ কারনে পুরাতন দাদ এর ঘরোয়া চিকিৎসা আমাদের সবার জানা দরকার।

দাদ কত প্রকার হতে পারে

মানবদেহের বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন ধরনের দাদ হতে পারে, শরীরের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ধরনের দাদ হওয়াকে ডাক্তার এবং বিশেষজ্ঞরা তাদের অবস্থান ভেদে শ্রেণীবদ্ধ করে থাকে। আপনার যদি দাদ এর সমস্যা হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই এই বিষয়গুলো আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে অথবা জানতে হবে যেন ভবিষ্যতে এই পুরাতন দাদ এর ঘরোয়া চিকিৎসা নিজেই করতে পারেন।

১ ঃ টিনিয়া ক্যাপাইটিস দাদ - এই ধরনের দাদ এর সংক্রমণ সাধারণত মাথার ত্বকে লক্ষ্য করা যায়, আপনার মাথায় যদি চুলকানি গোল ফুসকুড়ি হয় তাহলে বুঝবেন এটা টিনিয়া ক্যাপাইটিস দাদ।

২ ঃ টিনিয়া কর্পোরিস - এটি সাধারণত বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায়, এই প্রকারের দাদ সাধারণত শরীরের বিভিন্ন অংশে গোল বৃত্তাকার আকারে লালচে এবং উপরিভাগে ফুসকুড়ি লক্ষ্য করা যায়। অসহ্য রকমের চুলকানি দুই রানের চিপায়, হাঁটুতে পিঠে, শরীরের বিভিন্ন অংশে হতে পারে এই দাদ। 

৩ ঃ টিনিয়া বারবে - এই ধরনের দাদ সাধারণত মুখমণ্ডল অথবা দাড়ির আশেপাশে হতে পারে।

৪ ঃ টিনিয়া পেডিস - এই ধরনের দাদ সাধারণত পায়ের যে কোন জায়গায় হয়ে থাকে। 

৫ ঃ টিনিয়া আনগুইয়াম - এ ধরনের দাদ নখের মধ্য়ে সংক্রমন সৃষ্টি করে থাকে।

পুরাতন দাদ এর ঘরোয়া চিকিৎসা এবং সহজ উপায়ে সমস্যা কমানোর নির্দেশিকা 

ত্বকের অন্যতম বিরক্তিকর ছত্রাকজনিত সমস্যার নাম দাদ। অনেক সময় প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা না করালে এটি দীর্ঘদিন ধরে থেকে যায় এবং বারবার ফিরে আসতে পারে। তাই অনেকেই পুরাতন দাদ এর ঘরোয়া চিকিৎসা সম্পর্কে জানতে চান। তবে মনে রাখতে হবে, ঘরোয়া উপায়গুলো সাধারণত উপসর্গ কমাতে সাহায্য করে, কিন্তু দীর্ঘদিনের দাদ সম্পূর্ণ নিরাময়ের জন্য অনেক ক্ষেত্রে ডাক্তারের চিকিৎসাও প্রয়োজন হতে পারে।

এই আর্টিকেলে আমরা পুরাতন দাদ এর ঘরোয়া চিকিৎসা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব এবং কোন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি তা জানব।

দাদ কেন দীর্ঘদিন থাকে?

দাদ মূলত এক ধরনের ফাঙ্গাল ইনফেকশন। কিছু কারণে এটি পুরোনো বা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে যেতে পারে, যেমন:

  • আক্রান্ত স্থান পরিষ্কার না রাখা
  • একই কাপড় বারবার ব্যবহার করা
  • অতিরিক্ত ঘাম হওয়া
  • অসম্পূর্ণ চিকিৎসা গ্রহণ করা
  • পরিবারের অন্য কারও কাছ থেকে পুনরায় সংক্রমিত হওয়া
এসব কারণে অনেক মানুষ পুরাতন দাদ এর ঘরোয়া চিকিৎসা খুঁজে থাকেন।

পুরাতন দাদ এর ঘরোয়া চিকিৎসা করার আগে যা জানা জরুরি

ঘরোয়া উপায়গুলো সাধারণত ত্বক পরিষ্কার রাখা, চুলকানি কমানো এবং আক্রান্ত স্থান শুষ্ক রাখতে সাহায্য করে। তবে এগুলোকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে নয়, বরং সহায়ক পদ্ধতি হিসেবে দেখা উচিত।

১. আক্রান্ত স্থান পরিষ্কার ও শুকনো রাখুন

দাদের জীবাণু আর্দ্র পরিবেশে দ্রুত বৃদ্ধি পায়। তাই প্রতিদিন আক্রান্ত স্থান সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে ভালোভাবে শুকিয়ে নিন।

আরো পড়ুন  ঃ দাউদ হলে কি খাওয়া নিষেধ

অনেক ক্ষেত্রে পুরাতন দাদ এর ঘরোয়া চিকিৎসা হিসেবে এই সাধারণ অভ্যাসই বেশ উপকার এনে দেয়।

২. ঢিলেঢালা সুতি কাপড় ব্যবহার করুন

টাইট পোশাক ঘাম বাড়ায় এবং সংক্রমণকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে। সুতি কাপড় বাতাস চলাচল সহজ করে এবং ত্বককে শুষ্ক রাখতে সাহায্য করে।

৩. নারকেল তেল ব্যবহার

নারকেল তেলে কিছু প্রাকৃতিক উপাদান রয়েছে যা ত্বককে আর্দ্র রাখে এবং জ্বালাপোড়া কমাতে সাহায্য করতে পারে। পরিষ্কার ত্বকে অল্প পরিমাণ নারকেল তেল লাগানো যেতে পারে।

এটি পুরাতন দাদ এর ঘরোয়া চিকিৎসা হিসেবে অনেকেই ব্যবহার করেন, যদিও এর কার্যকারিতা ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে।

৪. অ্যালোভেরা জেল

অ্যালোভেরা ত্বককে শীতল অনুভূতি দেয় এবং চুলকানি কমাতে সাহায্য করতে পারে। আক্রান্ত স্থানে বিশুদ্ধ অ্যালোভেরা জেল দিনে ২–৩ বার ব্যবহার করা যেতে পারে।

৫. ব্যক্তিগত জিনিসপত্র আলাদা রাখুন

তোয়ালে, কাপড়, চাদর বা বালিশ অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করলে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। তাই পুরাতন দাদ এর ঘরোয়া চিকিৎসা অনুসরণ করার পাশাপাশি ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

কোন কাজগুলো এড়িয়ে চলবেন?

  • আক্রান্ত স্থান চুলকানো
  • ভেজা কাপড় দীর্ঘক্ষণ পরে থাকা
  • অন্যের তোয়ালে ব্যবহার করা
  • ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া স্টেরয়েড ক্রিম ব্যবহার করা

এসব ভুলের কারণে দাদ আরও জটিল হয়ে যেতে পারে এবং ঘরোয়া চিকিৎসা মাধ্যম থেকেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন:

  • দাদ কয়েক মাস ধরে রয়েছে
  • আক্রান্ত স্থান দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে
  • তীব্র চুলকানি বা ব্যথা হচ্ছে
  • পুঁজ বা সংক্রমণের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে
  • ঘরোয়া যত্নের পরও উন্নতি হচ্ছে না
এ ধরনের পরিস্থিতিতে শুধু শুধুমাত্র ঘরোয়া চিকিৎসা যথেষ্ট নাও হতে পারে।

ডাক্তারেরা সাধারণত যেসব মলম ও ওষুধ প্রেসক্রাইব করতে পারেন

পুরাতন দাদ বা দীর্ঘদিনের ছত্রাকজনিত সংক্রমণের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ঘরোয়া পরিচর্যা সব সময় যথেষ্ট নাও হতে পারে। সংক্রমণের তীব্রতা, আক্রান্ত স্থানের আকার এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে চিকিৎসক বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিফাঙ্গাল (ছত্রাকনাশক) ওষুধ ও মলম প্রেসক্রাইব করতে পারেন।

অ্যান্টিফাঙ্গাল মলম ও ক্রিম

দাদের প্রাথমিক ও মাঝারি পর্যায়ের চিকিৎসায় চিকিৎসক সাধারণত নিচের যেকোনো একটি অ্যান্টিফাঙ্গাল ক্রিম ব্যবহারের পরামর্শ দিতে পারেন:

  • Clotrimazole 1% Cream

  • Terbinafine 1% Cream

  • Ketoconazole 2% Cream

  • Luliconazole 1% Cream

  • Sertaconazole 2% Cream

  • Miconazole 2% Cream

  • Eberconazole 1% Cream

  • Ciclopirox Olamine Cream

এই ধরনের ক্রিম সাধারণত আক্রান্ত স্থানে নিয়মিত ব্যবহার করতে বলা হয় এবং লক্ষণ কমে গেলেও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ব্যবহার চালিয়ে যেতে হয়।

মুখে খাওয়ার অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ

যদি দাদ অনেক পুরোনো হয়, শরীরের বড় অংশে ছড়িয়ে পড়ে অথবা বারবার ফিরে আসে, তাহলে চিকিৎসক মুখে খাওয়ার অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ দিতে পারেন। যেমন:

  • Terbinafine Tablet

  • Itraconazole Capsule

  • Fluconazole Tablet

  • Griseofulvin Tablet

এসব ওষুধ সাধারণত নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সেবন করতে হয় এবং চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান ছাড়া ব্যবহার করা উচিত নয়।

চুলকানি কমানোর ওষুধ

দাদের কারণে অতিরিক্ত চুলকানি হলে চিকিৎসক কখনও কখনও অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধ দিতে পারেন, যেমন:

  • Cetirizine

  • Fexofenadine

  • Levocetirizine

এসব ওষুধ চুলকানিজনিত অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করে, তবে এগুলো দাদের মূল চিকিৎসা নয়।

গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

বর্তমানে বাজারে অনেক স্টেরয়েডযুক্ত কম্বিনেশন ক্রিম পাওয়া যায়, যা ব্যবহার করলে শুরুতে সাময়িক আরাম মিললেও পরে দাদ আরও জটিল ও বিস্তৃত হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো স্টেরয়েডযুক্ত ক্রিম ব্যবহার করা উচিত নয়।

দীর্ঘদিনের দাদ, বারবার ফিরে আসা দাদ অথবা শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়া দাদের ক্ষেত্রে দ্রুত একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।

উপসংহার

পুরাতন দাদ এর ঘরোয়া চিকিৎসা আপনার অনেক ক্ষেত্রে ত্বকের অস্বস্তি কমাতে এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। আক্রান্ত স্থান পরিষ্কার রাখা, শুকনো রাখা, সুতি কাপড় ব্যবহার এবং ভালো ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে দীর্ঘদিনের বা বারবার ফিরে আসা দাদের ক্ষেত্রে অবশ্যই একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সঠিক যত্ন এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ করলে পুরোনো দাদের সমস্যাও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url